সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলায় পরিচালিত ১২টি ইটভাটার একটিরও পরিবেশ অধিদপ্তরের বৈধ ছাড়পত্র নেই। আবেদন জমা দিয়েই বছরের পর বছর ধরে এসব ভাটা অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৯৪টি ইটভাটা রয়েছে, যার মধ্যে শ্যামনগর উপজেলায় রয়েছে ১২টি। এসব ভাটার মধ্যে ঝিকঝাক ও সনাতনী—দুই ধরনের ভাটাই রয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াও এসব ইটভাটার কোনো সরকারি অনুমোদন বা লাইসেন্স নেই। শুধু উচ্চ আদালতে দায়ের করা একটি রিটের সুযোগ নিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে বছরের পর বছর ধরে অবাধে পরিচালিত হচ্ছে এসব অবৈধ ভাটা।
সম্প্রতি উচ্চ আদালত দেশের সব অবৈধ ইটভাটা বন্ধের নির্দেশ দিলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করেই শ্যামনগরের এসব ইটভাটা পুরোদমে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
জনবসতিপূর্ণ এলাকা ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশেই গড়ে ওঠা এসব ইটভাটার কালো বিষাক্ত ধোঁয়ায় মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীরা জানায়, ক্লাস চলাকালে ইটভাটার ধোঁয়া সরাসরি নাক ও চোখে প্রবেশ করে। এতে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, চোখ জ্বালা করে এবং অসুস্থতা দেখা দেয়।
এছাড়া ইটভাটার ট্রাক, ভেকু ও ভারী যন্ত্রপাতির শব্দে ক্লাসে শিক্ষকদের কথা শোনা যায় না। বিদ্যালয়ের মাঠে খেলাধুলার সময় দ্রুতগতির ট্রাক চলাচলের কারণে শিক্ষার্থীরা সবসময় আতঙ্কে থাকে।
স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর নজরদারি না থাকায় এসব অবৈধ ভাটায় কয়লার পরিবর্তে কাঠ, সয়াবিনের গাঁথ, তুষকাঠ ও টায়ার পোড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইটভাটায় কর্মরত কয়েকজন শ্রমিক জানান, ভাটামালিকদের নির্দেশে দিনে অল্প কয়লা এবং রাতভর কাঠ, তুষকাঠ ও টায়ার ব্যবহার করে ইট পোড়ানো হয়।
সোনার মোড় এলাকার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন,
“আমাদের ৩০ বছরের বসতভিটা। আগে একটি ইটভাটা ছিল, এখন চারপাশে চারটি। ধুলাবালি ও ধোঁয়ায় ঘরবাড়ি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গাছ লাগানো যাচ্ছে না, ফসলও হচ্ছে না।”
শ্যামনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মো. তরিকুল ইসলাম বলেন,
“ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় কাঠ দিয়ে ইট পোড়ানো হলে বিষাক্ত ধোঁয়ার কারণে ব্রংকাইটিস, শ্বাসকষ্টসহ শ্বাসতন্ত্রের নানা রোগ বাড়ে। শিশু ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে।”
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ওয়ালিউল্লাহ জানান,
“উপজেলার অধিকাংশ ইটভাটা কৃষিজমিতে গড়ে উঠেছে। কাঠ পোড়ানোর কারণে ফসলের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।”
সাতক্ষীরা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন,
“শ্যামনগর থেকে ৯টি ইটভাটা পরিবেশ ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেছে। আমি নতুন দায়িত্বে এসেছি। সরেজমিনে পরিদর্শন করে যাচাই-বাছাইয়ের পর ছাড়পত্র দেওয়া হবে।”
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুন্নাহার কনক বলেন,
“যেহেতু এসব ইটভাটার পরিবেশ ছাড়পত্র নেই, সেক্ষেত্রে পরিবেশ অধিদপ্তরই আইনগত ব্যবস্থা নেবে।”
মো: আব্দুর রশিদ গাজী
স্টাফ রিপোর্টার