২৩শে জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। আগের দিন নৌকাযোগে তুরাগ নদীতে মিছিল করেন ছাত্র লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী এবং পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। ধাওয়া খেয়ে ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দেন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা। এতে সবাই সাঁতরে তীরে উঠলেও দুজন পানিতে তলিয়ে যায়।

বুধ ও বৃহস্পতিবার তাদের লাশ আশুলিয়া ও আমিনবাজার এলাকার নদীতে ভেসে উঠে। পুলিশ লাশ দুটি উদ্ধার করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। নিহতরা হলো। সুমন (১৭) ও আরিফুল ইসলাম রাকিব (২০)। দুজনই রাজধানীর তুরাগের রানাভোগ এলাকার বাসিন্দা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের মেরে ফেলা হয়েছে বলে দলটির নেতাকর্মীরা দাবি করে। 

পুলিশ বলছে ভিন্ন কথা। শনিবার পুলিশ সদর দপ্তর এ সংক্রান্ত তথ্যকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা বলেছে। এ ঘটনায় পুলিশের তিনটি ইউনিট তদন্তে নামে। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি টিম ছাত্রলীগের মিছিলে পুলিশের ধাওয়া দেওয়ার ফলে দুজনের মৃত্যুর সত্যতা পেয়েছে। 

ডিবি’র ওই টিমের ভাষায় ২২ জুন প্রায় ৩টার দিকে তুরাগ থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শফিকুল ইসলাম শফিকের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের ২৫/৩০ জন নেতাকর্মী নৌকাযোগে আশুলিয়ার রুস্তমপুর ঘাট থেকে আশুলিয়া বাজার ঘাটে মিছিল করার জন্য আসে। তুরাগের নলভোগ এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা কফিল উদ্দিন মেম্বার এবং রানাভোলা এলাকার মামুন তাদের সার্বিক সহযোগিতা করে।
তারা রস্তুমপুর ঘাট থেকে অজয় নামে এক মাঝিকে ঠিক করে আশুলিয়া বাজার ঘাটের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। ঘাটে পৌঁছে নৌকা থেকে নামার সময় বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মী , সাধারণ মানুষ ও পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। এ সময় তারা দ্রুত নৌকায় উঠে পালানোর চেষ্টা করে এবং তাড়াহুড়ার কারণে নৌকার নোঙর তুলতে ব্যর্থ হয়। এসময় পুলিশ নৌকার নোঙর ধরে ফেললে নেতাকর্মীরা আতঙ্কিত হয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয়।
পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে সাতজনকে আটক করে। অন্যরা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। নদীতে তীব্র স্রোত থাকায় সুমন ও রাকিব নামে দুজন পানিতে তলিয়ে যায়। তাৎক্ষণিকভাবে কেউই জানতে না পারলেও পরে তাদের মরদেহ উদ্ধার হয়। পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে মরদেহগুলো বিকৃত হয়েগেছে।
 ২৪ জুন সকালে গাবতলী লামারঘাট এলাকায় রাকিবের মরদেহ ভেসে উঠে। পরে স্থানীয়রা আমিনবাজার নৌ পুলিশকে অবহিত করেন। নৌ পুলিশ প্রথমে অজ্ঞাত হিসেবে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করে মর্গে প্রেরণ করে। তবে লাশ উদ্ধারের কিছুক্ষণ পরই খবর পেয়ে ছুটে আসে আরিফের পরিবার।
নিহত রাকিবের বাবা আব্দুল হাই জানায়, আমার ছেলে ২২ জুন ঘুরতে বেরিয়েছিল। কিছুক্ষণ পর জানতে পারি, তাদেরকে বিএনপির নেতা, স্থানীয় জনতা ও পুলিশ ধাওয়া দিয়েছে। এতে আতঙ্কে সবাই নদীতে ঝাঁপ দেয়। সবাই উঠতে পারলেও আরিফ উঠতে পারেনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে নদীতে লাশ উদ্ধারে খবর শুনে এসে দেখি, এটা আমার ছেলেরই লাশ। নিহত আরিফ ছাত্রলীগের রাজনীতি করত বলে জানায় বাবা। 
২৫ জুন দিবাগত রাত সাড়ে ১২টায় আশুলিয়া বাজার এলাকায় তুরাগ নদীতে ভাসমান অবস্থায় সুমনের মরদেহ উদ্ধার করে আশুলিয়া থানা পুলিশ। পরে তার মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়। খবর পেয়ে সুমনের পরিবার এসে লাশ শনাক্ত করে, ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ নিয়ে যায়। 
নিহত সুমনের বড় ভাই সালাহ উদ্দিন জানায়, সুমন বাসায় বলেছিল, বন্ধুদের সঙ্গে তুরাগ নদীতে ঘুরতে যাচ্ছে। কিন্তু যাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকে তার ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে তার বন্ধুদের কাছ থেকে জানতে পারি, তারা মিছিল করতে গেছে। লোকজন আর পুলিশ তাদের ধাওয়া করলে তারা নদীতে ঝাঁপ দেয়। সুমন সাঁতার না জানায় পানিতে তলিয়ে যায়।
বিষয়টি অনেকেই দিনভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছেন এবং বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মীকে খুন করে তুরাগ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে তিনজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে, আরও চারজনের মরদেহ উদ্ধারে কাজ চলছে।
পোস্টে আরও দাবি করা হয়, সুমন তুরাগ থানার ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং ২২ জুন আওয়ামী লীগের একটি কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণে তাকে ধাওয়া করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। সুমনসহ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হত্যার অভিযোগ তুলে বিচার দাবি করেছেন সাবেক সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মাহমুদ হাসান রিপন।
শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি দাবি করেন, তুরাগ নদী থেকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের তিন নেতাকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং আরও চারজন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে আশুলিয়া ও তুরাগ থানা পুলিশ এসব দাবির কোনো সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি। 

সন্ধ্যার দিকে পুলিশ সদর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানায়, এ ধরনের কোনো ঘটনার তথ্য বা অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আসেনি। জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি এবং গুজব ছড়ানোর উদ্দেশ্যে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে। মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা চলছে। এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।
সাধারণ মানুষের ভাষায় যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের অপপ্রচার চালাচ্ছে বা গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। সাধারণ মানুষের দাবীকে সন্মান দেখিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট ইউনিটগুলো তৎপর রয়েছে এবং এ ধরনের অপপ্রচারে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে ডিএমপি।